Vorer kagoz
jayjay din
ইতিহাসের দায়মুক্তির প্রথম ফাঁসিঅবশেষে কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকরযাযাদি রিপোর্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে এ ফাঁসি কার্যকর করার মধ্যদিয়ে রচিত হলো নতুন ইতিহাস। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার প্রথম রায় কার্যকর করার মধ্যদিয়ে দায়মুক্ত হলো দেশ, কলঙ্কমুক্ত হলো গোটা জাতি। বিজয় আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে দেশের ১৬ কোটি মানুষের বুকে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বের হয় আনন্দ মিছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় ও সশস্ত্র বিরোধিতাকারী কাদের মোল্লার ফাঁসির (ফাঁসির সিরিয়াল নাম্বার ২২০১) লিভারে টান দিয়ে ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন করেন প্রধান জল্লাদ মো. শাহজাহান ভুইয়া। তার সঙ্গে ছিলেন ফারুক, হামিদ, সারোয়ার, তানভীর ও জনি। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলার পাঁচ আসামিকে ফাঁসি কার্যকরের দায়িত্ব পালন করে জল্লাদ শাহজাহান ভুইয়া। সাধারণত রাত ১২টা এক মিনিটে ফাঁসি দেয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে যেহেতু রাত ১২টা এক মিনিট ছুটির দিন শুক্রবার, তাই আগেই এ ফাঁসি কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিশে ফাঁসি কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ।
কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার সময় উপস্থিত ছিলেন আইজি প্রিজন মাঈনুদ্দিন খন্দকার, এডিশনাল আইজি প্রিজন কর্নেল ইফতেখারুল ?আলম, ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দার, ঢাকা সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধা, ঢাকার ডিসি গোলাম মোক্তাদির, ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শেখ ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, ডিএমপি কমিশনারের প্রতিনিধি ডিসি ফিন্যান্স ইমাম হোসেন প্রমুখ।
ফাঁসি দেয়ার আগে কাদের মোল্লাকে গোসল করিয়ে একজন মওলানার মাধ্যমে তওবা পড়িয়ে নেন কারা কর্তৃপক্ষ। এ সময় তার কাছ থেকে তার শেষ কোনো কথা থাকলে তাও শুনে নেন কারা কর্তৃপক্ষ। ফাঁসির মঞ্চে নেয়ার পর আসামির মাথায় পরানো হয় একটি কালো রঙের 'যমটুপি'।
দায়িত্বশীল একটি কারা সূত্র জানায়, ফাঁসি রাতেই কার্যকর করা হবে তা জানার পর কাদের মোল্লা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। রাতে পরিবার পরিজনের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করার পরও তিনি অনেকটা স্বাভাবিক কণ্ঠেই কথাবার্তা বলেছেন। কিন্তু জল্লাদ তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে অনেকটা বিমর্ষ দেখা গেছে। কনডেম সেল থেকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত সামান্য দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও অনেকটা সময় লাগিয়েছেন। ওই সূত্র জানায়, অনেকটা ধরাধরি করেই কাদের মোল্লাকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়েছে।
সেখানে তোলার পর কাদের মোল্লার দুই হাত পেছন দিকে বাঁধা হয়। এ সময় ফাঁসির মঞ্চের সামনে উপস্থিত ছিলেন কারা কর্তৃপক্ষ, সিভিল সার্জন ও একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ফাঁসির মঞ্চে প্রস্তুত ছিলেন জল্লাদও। মঞ্চে তোলার পর কাদের মোল্লার দুই পা-ও বাঁধা হয়। পরানো হয় ফাঁসির দড়ি।
এ সময় কারা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা রুমালটি হাত থেকে নিচে ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের লিভারে টান দেন। লিভারটি টান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফাঁসির মঞ্চের নিচে চলে যান কাদের। এ সময় তিনি মাটি থেকে ৪-৫ ফুট শূন্যে ঝুলে থাকেন। এতে মুহূর্তের মধ্যেই তার ঘাড়ের হাড় ভেঙে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়।
পরবর্তীতে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কারা কর্তৃপক্ষ কাদের মোল্লার লাশ তার নিকটাত্মীয়-স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন। রাত ১১টা ১০ মিনিটে কাদের মোল্লার লাশ বহনকারী সাদা রঙের অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে যায়। একই সঙ্গে আরো দুটি অ্যাম্বুলেন্স লাশ বহনকারী গাড়িটির আগে-পিছে বের হয়। অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে র্যাব-পুলিশ-বিজিবির ১৪টি গাড়ির একটি বহরকে রওনা হতে দেখা যায়। এর সামনে পেছনে পুলিশের আটটি, র্যাবের দুটি, বিজিবির দুটি গাড়ি রয়েছে।
রাজধানীর বাবুবাজার সেতু হয়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়াঘাট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ফরিদপুরের সদরপুরে জামায়াত নেতার বাড়িতে যাবে বলে কারাফটকে কর্তব্যরত খিলগাঁও থানার ওসি শেখ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন। কাদের মোল্লার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নেয়ার জন্য 'কনকচাঁপা' নামে একটি ফেরি মাওয়াঘাটে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানিয়েছেন।
লাশবাহী গাড়ি যাবে ফরিদপুরের সদরপুরে আমিরাবাদ গ্রামে কাদের মোল্লার বাড়িতে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। সেখানে তার ছোট ভাই মোল্লা মাঈনুদ্দিন আহম্মেদ রয়েছেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব মাঈনুদ্দিন সদরপুর উপজেলার ভাষানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
এর আগে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। কিন্তু তার আইনজীবীদের আবেদনে রাত ১০টা ২০ মিনিটে চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রায় কার্যকর করা স্থগিত করেন।
বুধ ও বৃহস্পতিবার রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে এবং রিভিউয়ের মূল আবেদনের (অন মেরিট) ওপর দু'দিনের শুনানি শেষে আসামিপক্ষের দুটি রিভিউ আবেদনই খারিজ করে আদেশ দেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। এর ফলে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পথে আর কোনো আইনগত বাধা না থাকায় ফের ফাঁসির প্রস্তুতি নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। এভাবেই আইনগত সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে কার্যকর হলো তার মৃত্যুদ-াদেশ।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ১৩ জুলাই অন্য একটি মামলায় কাদের মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ১৪ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তদন্ত শুরু হয় ওই বছরের ২১ জুলাই। গত বছরের ২৮ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩ জুলাই থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল-২।
কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ক্ষুব্ধ মানুষ সেদিন বিকাল থেকে জড়ো হতে থাকে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে। প্রতিবাদী এই মানুষগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে তোলে গণজাগরণ মঞ্চ।
এরপর সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধনের ফলে আসামিপক্ষের মতো রাষ্ট্রপক্ষও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সমান সুযোগ পায়। আগে আইনে দ-াদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ ছিল না।
আইন সংশোধনের পর গত ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদ-) চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন ৪ মার্চ আপিল করেন কাদের মোল্লা। ১ এপ্রিল থেকে আপিলের শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষ হওয়ার ৫৫ দিনের মাথায় ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। এরপর রায়ের অনুলিপি সুপ্রিমকোর্ট থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
গত ৮ ডিসেম্বর বিকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন