সাতক্ষীরায় অভিযানের নামে চলছে বর্বরতা
ইনকিলাব রিপোর্ট : গত কয়েকদিন ধরে সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। এলাকাবাসী এ অভিযানকে ‘বর্বরতা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তাদের ভাষায়, অভিযানের নামে যা চলছে আগে কখনই হয়নি। এমনকি একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীও এমন নির্মম অত্যাচার করেনি। অভিযানের নামে বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়াসহ ঘরের আসবাপত্র ভেঙে চুড়ে তছনছ করা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে যৌথ বাহিনীর সাথে অভিযানে অংশ নিচ্ছে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা। তারা তাদের হিংসা চরিতার্থ করার জন্য সবকিছু তছনছ করে লুটপাটও চালাচ্ছে। এসব কারণে সাতক্ষীরা জুড়ে যৌথবাহিনী এখন এক আতঙ্কের নাম। ভুক্তভোগীদের মতে, রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে আন্দোলনকারীদের দমনে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করার ঘটনায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সন্ত্রাস দমনেও কখনো এরকম বর্বরোচিত হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, গুলি, মহিলা ও শিশুদের বেধড়ক মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। যা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর ঘটানো হয়েছে। গত সোমবার রাতে আগরদাড়ি ইউনিয়নের সাতানি গ্রামের জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তি যৌথবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগরদাড়ি ও সাতানি গ্রামে ঢোকার পথে রাতের বেলায় যৌথবাহিনী ননস্টপ গুলি করতে করতে সামনের দিকে এগুতে থাকে। রীতিমতো ত্রাসের সৃষ্টি হয়। গুলিবিদ্ধ হন রিজিয়া নামে এক গৃহবধূ। ওইদিন যৌথবাহিনীর ধাওয়া খেয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পুকুরে পড়ে বাবু নামে এক যুবক নিহত হয়। ১৮ দলের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধের প্রথম দিন সকালে সাতক্ষীরা শহরের কদমতলা মোড়ে সড়ক অবরোধ করে মিছিল-সমাবেশ করে জামায়াত। পরে পুলিশ এসে ধাওয়া দিলে অবরোধকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন সাংবাদিক অপদস্ত হন যৌথবাহিনীর সদস্যদের হাতে। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে সদরের আগরদাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা কাশিমপুর গ্রামের আনারুল ইসলামের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর করে যৌথবাহিনী। একপর্যায়ে সেখানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগরদাড়ি গ্রামের মাওলানা আব্দুল গাফফারের বসতবাড়ি ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। সোমবার রাতে শ্যামনগরেও এ অভিযান চলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, যৌথ বাহিনীর সদস্যরা উপজেলার খানপুর বাজারের আব্দুর রশিদের চায়ের দোকান ভাঙচুর করে। সোমবার গভীর রাতে ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ারুল আলমের নেতৃত্বে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি’র যৌথ অভিযান পরিচালনা করে উপজেলার শ্রীফলকাঠী ও খানপুর গ্রাম থেকে ৬ জনকে আটক করে। আটককৃতরা হচ্ছেন- শ্রীফলকাঠী গ্রামের আদম আলী গাজীর পুত্র আব্দুল জলিল (২৮), জেহের আলী মোল্যার পুত্র মহাসিন আলী (৩৫), খানপুর গ্রামের আঃ মালেকের পুত্র আকতার হোসেন (২২), আরশাদ আলীর পুত্র আব্দুল হামিদ (৪৭), গহর আলী চৌকিদারের পুত্র আরশাদ আলী (৪৮), আকছেদুর রহমানের পুত্র আনিছুর রহমান (৩১)। অবরোধের কারণে আটককৃতদের শ্যামনগর থানা হাজতে রাখা হয়েছিল। গভীর রাতে নিজবাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় নিরীহ ব্যক্তিদের আটক করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এছাড়া আশাশুনি থেকে একজন ও পাটকেলঘাটা থেকে ২ জনকে আটক করে পুলিশ। সদরের আগরদাড়ি এলাকায় অভিযানকালে গৃহবধূ খালেদা খাতুনসহ ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয় বলে জামায়াতের দলীয় সূত্র জানায়। সোমবার গভীর রাতে পাটকেলঘাটা থানা পুলিশ ও যৌথবাহিনীর অভিযানে আটক হয় দু’সহোদর। তাঁরা হলেন থানার কুমিরা গ্রামের মো. মহিউদ্দীনের পুত্র মোস্তাফিজুর রহমান (৩৫) এবং ই¯্রাফিল হোসেন (২২)। এ সময় তালা উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গাজী সুজায়েত আলী, সহ-সেক্রেটারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, কর্ম-পরিষদ সদস্য মাও. রেজাউল করিম, এড. বাসারাতুল্লাহ আওরঙ্গী বাবলাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতার বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমীর সাবেক এমপি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল খালেক, সদর আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল গফফর এর বাড়িঘর যৌথ বাহিনী ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার ও স্থানীয়রা। সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখে এ বাহিনীর সদস্যরা। ওই দিন সন্ধ্যায় সদরের সাতানি ইউনিয়নের ভাদড়া গ্রামে সদর পশ্চিম জামায়াতের আমীরের বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। তাকে বাড়ি না পেয়ে তার বসতবাড়ি ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে। কিছুক্ষণ পর নায়েবে আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলামের বাড়ি ঘেরাও করে যৌথ বাহিনী। পরে তাকে না পেয়ে তার বাড়ি একইভাবে ভাঙচুর করা হয়। রাত ৮টার দিকে আবারও অভিযান চালানো হয় জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আব্দুল খালেকের খলিল নগরের বাড়িতে। এসময় বাড়িতে তাকে না পেয়ে তার দ্বিতলা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় বুলডোজার দিয়ে। এতে ভবনটি এক পাশে হেলে পড়ে। এদিকে, যৌথ বাহিনীর অভিযানের সংবাদ স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে পড়তে না পারে সেজন্য গত কয়েক দিন ধরে সাতক্ষীরায় কোন সংবাদপত্রের গাড়ি প্রবেশ করতে দিচ্ছে না পুলিশ। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, সংবাদপত্রবাহী গাড়ি সাতক্ষীরায় প্রবেশের আগেই তা মহাসড়ক থেকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, মঙ্গলবার দিবাগত গভীররাতে কালীগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযান চলে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন