বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৩


প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৩ ০১:৩৪:৩৪ অঅ-অ+ printer জামায়াতের ভিত যে কারণে শক্ত সাংগঠনিকভাবে জামায়াতে ইসলামী সাতক্ষীরায় খুবই শক্তিশালী। আর এ শক্তির পুরোটাই এখন প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব নাশকতা ও সহিংসতায়। সাবি্বর নেওয়াজ/এম কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা থেকে সাংগঠনিকভাবে জামায়াতে ইসলামী সাতক্ষীরায় খুবই শক্তিশালী। আর এ শক্তির পুরোটাই এখন প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব নাশকতা ও সহিংসতায়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। শহরের বিভিন্ন বাড়িতে অনেকটা উদ্বাস্তুর মতোই এসে আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের বেশির ভাগেরই বাড়িতে অগি্নসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। সহায়সম্বল হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তারা। সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ বলছেন, শান্তিপ্রিয় এ জেলার অধিবাসীরা নৃশংসতার এমন রূপ নিকট অতীতে আর দেখেননি। সাতক্ষীরায় জামায়াতের আর্থিক ও সাংগঠনিক শক্তির নেপথ্য কারণ খুঁজেছে সমকাল। দেখা গেছে, আশির দশকের পর এ জেলায় প্রশাসনিক ক্ষমতা করায়ত্ত করতে শুরু করে জামায়াত। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নানাভাবে জনসাধারণের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে।জামায়াতের ভিত যে কারণে শক্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, ভাংচুর করা ও গোলার ধান, গরু-বাছুর লুটপাট হয়ে যাওয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে হাহাকার উঠছে শত শত হিন্দু পরিবারে। সদর উপজেলার আগরদাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তাপস আচার্য সমকালকে বলেন, জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা প্রথম দফায় তার বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। দ্বিতীয় দফায় পেট্রোল ঢেলে ওই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মালপত্র লুটপাট করা হয়। বর্তমানে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে শহরের পলাশপোল এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একই গ্রামের গোপাল মণ্ডল বলেন, বাড়ি ভাংচুরের পর তিনিও পরিবার নিয়ে প্রাণভয়ে শহরে আত্মগোপন করেছেন। তার গোয়ালের সব গরু জামায়াতের কর্মীরা লুট করে নিয়ে গেছে। তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন। সাতক্ষীরা জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি বিশ্বজিৎ সাধু সমকালকে বলেন, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো থেকে বহু সংখ্যালঘু পরিবার জামায়াতের তাণ্ডব থেকে বাঁচতে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কবে নিজ ভিটায় তারা ফিরতে পারবেন, তা তাদের অজানা। অনেকেই বললেন, যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হলেও এখনও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে স্বস্তি ফেরেনি। সহিংসতার বীভৎস রূপ :বিজয় দিবসের মাত্র একদিন পর গত মঙ্গলবার কালীগঞ্জের বিষ্ণুপুরে আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম আলীকে যৌথ বাহিনীকে সহযোগিতা করার অভিযোগে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৩ ডিসেম্বর সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দেবনগর এলাকা থেকে ১০ বছরের শিশু রিয়াদ হোসেনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, জামায়াত-শিবির তাকে বাড়ি থেকে অপহরণ করে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায়। ১২ ডিসেম্বর রাতে কুপিয়ে খুন করা হয় কলারোয়া উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান ও সরসকাটি গ্রামের যুবলীগ নেতা জজ মিয়াকে। ১১ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বেদনগর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হামিদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৬ ডিসেম্বর একই উপজেলার কুচপুকুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ২৬ নভেম্বর দুপুরে কলারোয়া উপজেলার ছলিমপুর এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম ও বিকেলে দেয়াড়া গ্রামের যুবলীগ নেতা রবিউল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২১ নভেম্বর সন্ধ্যায় দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া বাজারে শত শত মানুষের সামনে দেবহাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক আবু রায়হানকে হত্যা করে বীরদর্পে চলে যায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। সাতক্ষীরায় জামায়াত যেভাবে শক্তিশালী :জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ আবু আহমেদ সমকালকে বলেন, আশির দশক থেকেই জামায়াত এ জেলায় ভিত গাড়তে শুরু করে। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত জেলার অধিকাংশ আসনেই জামায়াতের দলীয় প্রার্থীরা জয়ী হয়ে সরকারি সুবিধা নিয়ে অসংখ্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। বিভিন্ন অর্থলগি্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে জেলা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত জামায়াতের নেতাকর্মীরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ইয়ানাতের নামে চাঁদা সংগ্রহ করে সেই টাকা ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে নাশকতা সৃষ্টির কাজে। তিনি আরও বলেন, দেশ স্বাধীনের পর ভারত থেকে বহু মানুষ বিনিময় করে সাতক্ষীরায় এসে বসবাস শুরু করে। এদের অধিকাংশই ভারতবিরোধী। ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে এ জেলার অধিকাংশ আসনে মুসলিম লীগের প্রার্থী জয়লাভ করে। সাতক্ষীরা সদর আসনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে খান এ সবুর বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। সেই থেকে মুসলিম লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায় সাতক্ষীরা। পরে মুসলিম লীগের সমর্থকরাই জামায়াতের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জেলাব্যাপী শক্তিশালী একটি ঘাঁটি তৈরি করতে সক্ষম হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সাতক্ষীরার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটি আসনেই জামায়াতদলীয় প্রার্থী জয়লাভ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট শেখ আনসার আলী এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ থেকে টানা ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরপর তিনটি নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী কাজী শামছুর রহমান সাতক্ষীরা-১ (সদর) আসনে এমপি হন। এ ছাড়া সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি) আসনে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে মাওলানা রিয়াছাত আলী বিশ্বাস এবং সাতক্ষীরা-৫ (শ্যামনগর) আসনে ওই দুটি নির্বাচনে গাজী নজরুল ইসলাম এমপি নির্বাচিত হন। অবশ্য ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার সব ক'টি আসনে জামায়াতের ভরাডুবি হয়। এ নির্বাচনে জেলার চারটি আসনে জয়লাভ করেন মহাজোটের প্রার্থীরা। জেলা ১৪ দলের সমন্বয়কারী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুস্তফা লুতফুল্লাহ সমকালকে বলেন, ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সাতক্ষীরায় জামায়াত তাদের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। আর্থিক শক্তির প্রভাব খাটিয়ে তারা সংগঠনকেও শক্তিশালী করে তোলে, যার পুরোটাই এখন সাধারণ মানুষের জীবননাশের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্যামনগরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিক্ষোভএদিকে শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানান, কালীগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম আলী হত্যার প্রতিবাদে শ্যামনগরে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বুধবার বিকেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কার্যালয় চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন, ছাত্রলীগের সহসভাপতি আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান প্রমুখ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন