সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাতাসে নিকোটিন, আড়ালে শরীরসঙ্গ
21 Dec, 2013
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, চিত্র পাল্টে যায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের। বিকেলের ভ্রমণ আর আড্ডাপ্রিয় মানুষগুলো ঘরে ফেরার আগেই উদ্যানের বিভিন্ন রাস্তা আর আনাচে-কানাচে অবস্থান নেন তিন শ্রেণীর মানুষ। সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে তারা একটু আলাদা, একটু অন্যরকম। তাদের চলাফেরা আর আচার-আচরণে সহজেই চিনে নিতে পারেন অনেকেই। এই তিন শ্রেণীর মানুষ হলেন- মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী আর যৌনকর্মী।
বিকেল থেকে রাতের অন্ধকারে ওই তিন শ্রেণীর মানুষের অবাধ বিচরণের কারণেই হারিয়ে যেতে বসেছে স্বাধীনতার ইতিহাস বহনকারী এ উদ্যানের অহঙ্কার। এছাড়া উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশার নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠায় প্রতিদিনই অস্বস্তিতে পড়ছেন উদ্যানে ঘুরতে আসা সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি বুঝে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই আর এখানে ঘুরতে আসেন না।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নামে এ উদ্যানের নাম রাখা হয়। এর আগে এটা ছিল রেসকোর্স ময়দান।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এ ময়দানেই পাকিস্তানি হানদারবাহিনী বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এছাড়া ইট-পাথরের শহরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে ভ্রমণপিয়াসী মানুষ ছুটে আসেন এ উদ্যানে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ উদ্যানে শিখা চিরন্তন ছাড়াও গড়ে তোলা হয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ এবং গ্লাস টাওয়ার। এ কারণে উদ্যানে বেড়েছে দর্শণার্থীর সংখ্যা।
কিন্তু উদ্যানে বেড়াতে বা আড্ডা দিতে আসা মানুষ মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী আর যৌনকর্মীদের কারণে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। এছাড়া উদ্যানটি মাদক গ্রহণের নিরাপদ জায়গা হয়ে ওঠায় অভিভাবকরাও চিন্তিত।
সূত্র মতে, গাঁজা থেকে শুরু করে ফেনসিডিল, হেরোইন, মদ, ইয়াবাসহ সব ধরণের মাদক বিক্রি হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আর মাদকসেবীরা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের কাছ থেকে এসব মাদক সংগ্রহ করে উদ্যানের মধ্যে বসেই তা সেবন করেন। এতে স্বস্তির জায়গাটুকু অস্বস্তিতে ভরে যায়। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ বাতাসে ছুটে বেড়ায় বিষাক্ত নিকোটিন।
রাত যত গভীর হয়, উদ্যানের চেহারা ততোই বিচিত্র হতে থাকে। গোল হয়ে বসা কিছু মানুষ গানের আসর জমিয়ে তোলেন। সঙ্গে চলে মাদক সেবন। এ আসরে মেয়েদের উপস্থিতিও থাকে চোখে পড়ার মতো। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘দম’ মারতে থাকেন। তাদের পরিচয় অনেকের কাছেই অজানা নয়। আর এমন আসর বসে ঠিক শিখা চিরন্তনের পাশেই।
বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে উদ্যানটি সাজানো হয়, নেয়া হয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু আয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে চেনা সেই দৃশ্য।
উদ্যানের ভেতরে অবৈধ ও আপত্তিকর যা কিছুই ঘটে, তা পুলিশের নাকের ডগায়ই ঘটে। কিন্তু কী এক অনিবার্য কারণে পুলিশ থাকে নীরব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ উদ্যানের ভেতরে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছেন। অনেক হকারকেও মাদকদ্রব্য বেচতে দেখা গেছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। তবে পুলিশ মাঝে মধ্যে যে দুএকজনকে আটক করে না তা নয়। কিন্তু উচ্চমহলের চাপে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা ছাড়া পেয়ে যায়। ব্যবসা থামে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষুদ্র এ মাদক ব্যবসায়ীদের নেথপ্যে রয়েছে স্থানীয় মাদক সম্রাট, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, ছাত্রনেতা ও কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা। মাস গেলেই তদের পকেটে চলে যায় মোটা অংকের মাসোহারা। একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারাও এর সঙ্গে জড়িত।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেড়াতে আসা নিউ মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জাহিদুর রহমান বাংলামেইলকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। কিন্তু সেই স্থানটিতে যেসব কার্যক্রম হয়, তা মেনে নেয়া যায় না। কর্তৃপক্ষকে বলবো, এটির সুষ্ঠু তদারকি করতে। কারণ এ উদ্যানেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের কাছে প্রথম আত্মসমর্পণ করেছিল। সেই দিক বিবেচনা করে হলেও এটির তদারকি করা জরুরি।’
এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেন যে কেউ অবাধে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য প্রবেশ পথে চেকপোস্টের কথাও উল্লেখ করেন এই ছাত্র। একই সঙ্গে নামমাত্র হলেও প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বাংলামেইলেকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেড়ানোর মতো কোনো পরিবেশই নেই। বিকেল হলেই রাজধানীর মাদকসেবীরা এখানে ভীড় জমাতে থাকে। এখানে মূলত নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। পুলিশের চোখের সামনেই ছোট ছোট অপরাধ সংঘটিত হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর উদ্যানের নিরিবিলি স্থানে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা মাদক গ্রহণ করেন। তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে মাদক গ্রহণের নিরাপদ স্থান হিসেবে মনে করে।
উদ্যানে মাদক বিক্রি, সেবন ও যৌনকর্মীদের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, ‘এখন কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে বলেন লোক পাঠাই’। এরপর তিনি আর কোনো কথা না বলে টেলিফোন রেখে দেন।
অন্যদিকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ উদ্যানে শুরু হয় যৌনকর্মীদের আনাগোনা। তারা বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গি করে উদ্যানে ঘুরতে আসা মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। তাদের নির্দিষ্ট খদ্দেরও আছেন, যারা নিয়মিত এ উদ্যানেই তাদের সঙ্গে যৌনকর্ম সারেন।
এছাড়া দিনেও স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখা গেছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাধিক যৌনকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা একটি অলিখিত নেটওয়ার্কের অধীনে নিয়ন্ত্রিত। এ পেশায় কীভাবে এলেন, জানতে চাইলে কল্পনা (ছদ্ম নাম) নামে এক যৌনকর্মী বলেন, ‘ভাই বাধ্য হয়ে এ লাইনে পা দিছি।’ তিনি এ পথে উপার্জন করা টাকা দিয়ে ছেলেকে স্কুলে পড়াচ্ছেন বলে জানান। ছেলে কোথায় থাকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গ্রামে আমার বাবা-মার কাছে আছে, প্রতি মাসে তার খরচ পাঠাই।’
কল্পনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপর এক যৌনকর্মী বলেন, ‘আপনারা এতো কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? সরকারকে বলেন, আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক। তাহলে আর এ পেশায় থাকবো না।’
এখানে কাউকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে হয় কিনা জানতে চাইলে তারা জানান, টাকা-পয়সা দিতে হয় না, তবে ভার্সিটির পোলারা এসে আমাদের মারধর করে এবং যারা আমাদের সঙ্গে মেলামেশা করে তাদের কাছে থাকা সব কিছু লুট করে নেয়।’
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ ধরনের অপকর্মের একাধিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। তার মধ্যে নারী ব্যবসা অন্যতম। আর এর নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে চাইলে আগেই ওই নেটওয়ার্কের হোতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। তারাই তাকে এলাকা ভাগ করে দেয়, উদ্যানের কোনে এরিয়ায় সে কাজ করবে। আর এ জন্য তাকে দিতে হয় কমিশন। বিনিময়ে পায় সব ধরনের নিরাপত্তা।
সূত্র জানায়, ওই নেটওয়ার্কের একাধিক ভ্রাম্যমাণ টিম রয়েছে, যারা নির্দিষ্ট এলাকায় দায়িত্ব পালন করে থাকে। আর এদের কাজ হলো অনৈতিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় হাতেনাতে ধরে খদ্দেরের কাছ থেকে সব লুটে নেওয়া।
সূত্র আরো জানায়, যখন কোনো যৌনকর্মী কোনো খদ্দের পেলে মোবাইলে সাংকেতিক ভাষায় ভ্রাম্যমাণ টিমকে জানায়। টিমের সদস্যরা সেখানে হাজির হয়ে খদ্দেরের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে মারধর করে ছেড়ে দেয়। পরে কেড়ে নেয়া জিনিপত্রের মধ্য থেকে একটি অংশ ওই যৌনকর্মীকে দেয়া হয়।
উৎসঃ বাংলামেইল
Share on facebook Share on email Share on print 6
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন