বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৩


উদ্বেগ আর আতঙ্কের মাঝে সাতক্ষীরার মানুষ 18 Dec, 2013 দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার মানুষ আইলা-সিডরের তাণ্ডব শেষ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার আগেই নেমে এসেছে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৮ দলীয় জোট অনড় অবস্থানে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে সংবিধানের মধ্য থেকেই নির্বাচন করার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় সরকার। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াত নেতাদের মুক্তির দাবির আন্দোলন। জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এ জনপদ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালায় যৌথবাহিনী। এসব ঘটনায় আতঙ্ক আর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় সাতক্ষীরা। চলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ১২ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর আরো বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সাতক্ষীরা। জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে ঘটে অনেক হতাহতের ঘটনা। এ অবস্থায় যৌথঅভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারিবাহিনী। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মীরা যোগ দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযানে ৫ জন জামায়াত-শিবির কর্মী নিহত হয়। এ সময় জামায়াত নেতাদের খোঁজ না পেয়ে তাদের বাড়ি-ঘর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সাঁড়াশি হামলায় গোটা জেলাজুড়ে বিরাজ করছে এক অজানা আতঙ্ক। বসতবাড়ি হয়েছে পুরুষশূন্য। এতে নারী ও শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না রোষানল থেকে। সার্বক্ষণিক মানুষের ভেতর আতঙ্ক বিরাজ করে, কখন যেন আবার যৌথবাহিনী ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা হানা দেয়। এসবের মধ্যে দিন কাটছে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সাতক্ষীরা জেলার সাতটি উপজেলার নিত্যদিনের ঘটনা। জেলা সদর থেকে শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়া উপজেলা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে দাবি বিরোধী দলের। অপদিকে অনেক স্থানে প্রতিপক্ষের হামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলেও জানা যায়। অন্যাদিকে কোনো কোনো অপারেশনে পুলিশের সঙ্গে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অস্ত্রও বহন করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি এডভোকেট আজিজুর রহমান জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে সদর উপজেলার আগরদাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনারুল ইসলামের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করেছে যৌথবাহিনী। তারা বুলড্রোজার দিয়ে তার বসতবাড়ি ভাঙচুর করে। এর আগে সোমবার রাতে শ্যামনগর উপজেলায় যৌথবাহিনী অভিযান চালায়। এ সময় তারা খানপুর বাজারে আব্দুর রশিদের চায়ের দোকান ভাঙচুর করে। তিনি আরো জানান, একই দিন সোমবার ভোর ৫টায় অভিযান চলে জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা জেলা আমীর সাবেক এমপি অধ্যক্ষ আব্দুল খালেকের খলিলনগর বাড়িতে।এ সময় বাড়িতে তাকে না পেয়ে তার দোতলা ভবন বুলড্রোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এতে ভবনটি এক পাশে হেলে পড়েছে। এ জামায়াত নেতা আরো জানান, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল গফফারের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সাতানি ইউনিয়নের ভাদড়া গ্রামের সদর (পশ্চিম) জামায়াতের আমীরের বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। তাকে বাড়ি না পেয়ে তার বসতবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয়। আজিজুর রহমান অভিযোগ করেন, এরপর জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলামের বাড়ি ঘেরাও করে তারা। এখানে তাকে না পেয়ে তার বাড়ির দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। সদর (পশ্চিম) জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা শাহাদাৎ হোসেনের গদাঘাটা গ্রামের নিজবাড়িতে যৌথবাহিনী হানা দেয়। এ সময় তারা তাকে বাড়িতে না পেয়ে বাড়ির দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। এছাড়া দেবহাটা, তালা, পাটকেলঘাটা, কালিগঞ্জে, বিষ্ণুপুরসহ কয়েকটি স্থানে অভিযানকালে ভাঙচুর হয়েছে বলে জানান জামায়াত নেতারা। সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নুরুল হুদা অভিযোগ করে বলেন, সোমবার রাত ১২টার দিকে সদর ভোমরা এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ ও বিজিবি। যৌথবাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় বিএনপি নেতা নুর ইসলামের বাড়ি ভাঙচুর করে। এছাড়া আশাশুনি উপজেলা জামায়াতের আমীর আবুবক্করসহ দুই নেতার বসতবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে তারা। এদিকে শ্যামনগর উপজেলায় র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি'র সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের ৬ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। গত সোমবার গভীর রাতে ৩৪ বিজিবি'র সিও লে. কর্নেল আনোয়ারুল আলমের নেতৃত্বে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি'র যৌথ অভিযান পরিচালনা করে উপজেলার শ্রীফলকাঠী ও খানপুর গ্রাম থেকে ৬ জনকে আটক করে। গভীর রাতে নিজবাড়ীতে ঘুমন্ত অবস্থায় এদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। অপরদিকে গত ২৮ অক্টোবর জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর থেকে গত ১১ মাসে (১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত) সাতক্ষীরা জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাতে জীবন দিতে হয়েছে ৩৩ জনকে। এ সময় ২৩ জন স্থানীয় সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার ও অপহরণ হয়েছে। অনেকে এলাকা ছাড়া। এরমধ্যে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি দৈনিক আমার দেশের প্রতিনিধি আলতাফ হোসেনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে তুলে নিয়ে গেলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি। সর্বশেষ মঙ্গলবার জামায়াতের ডাকা হরতাল ও ১৮ দলের অবরোধের সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী কদমতলা এলাকা থেকে দৈনিক প্রবাহের স্থানীয় প্রতিনিধি শহিদুল ইসলামের ক্যামেরা কেড়ে নেয়। এছাড়া উপস্থিত আরো ৮/১০ জন সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করে এলাকা থেকে বের করে দেয়। এদিকে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর সহিংসতায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত ও তাদের বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে জামায়াতের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর বলেন, সাতক্ষীরার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।অচিরেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। বিরোধী দল দেশের যেখানেই সহিংসতা চালাবে, সেখানেই যৌথবাহিনীর অভিযান চলে বলে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে। উৎসঃ শীর্ষ নিউজ Share on facebook Share on email Share on print 2

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন